গণভোট জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে চাই, তাহলে সরকার নয়- আপনাকেই, আমাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আর ‘হ্যাঁ’ ভোট আমাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছে।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধনকে ছেলেখেলায় পরিণত করা হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ থাকলে ১৭ মিনিটে রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে ফেলা হয়েছে; ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী তার উদাহরণ।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘গণভোট ২০২৬ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আলী রীয়াজ বলেন, গণভোট এই সরকারের একার বিষয় নয়। গণভোট হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। আমি, আপনি নাগরিক হিসেবে কী ভূমিকা রাখব, সেটার প্রশ্ন।
তিনি বলেন, গণভোটকে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অন্তর্বর্তী সরকার আর ১০-১২ দিনের বেশি দায়িত্বে থাকবে না; কিন্তু বাংলাদেশ পরিবর্তনের জন্য যে ১৪০০ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, ১৬ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন, যারা গুম হয়েছেন, খুন হয়েছেন- যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, তারা আপনাকে-আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। সেই দায়িত্ব আমাদের অনুভব করতে হবে।
বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে আলী রিয়াজ বলেন, ২০১৯ সালের জানুয়ারির সংবাদপত্রগুলো পড়লে বিচার বিভাগের ভয়াবহ অবস্থা বোঝা যায়। গ্রামের একজন মানুষ গায়েব মামলায় জামিনের জন্য ঢাকায় ছুটেছে। জুলাই জাতীয় সনদ বলছে- বিভাগে বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করতে হবে, উপজেলায় আদালত থাকতে হবে। ইনসাফ চাইলে আদালত মানুষের দোরগোড়ায় নিতে হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়ে বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৬ বছরে যে পরিমাণ টাকা লুট হয়েছে, তা দিয়ে দেশের সব মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যেত; কিন্তু দুদককে কার্যত বিরোধী দল দমন কমিশনে পরিণত করা হয়েছিল। কারণ কমিশন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় নিয়োগ পেতেন। জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং সংসদের ফাইনান্সিয়াল ওভারসাইট কমিটিগুলো বিরোধী দলের সভাপতিত্বে হবে, যেন ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করা যায়।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন প্রসঙ্গে বক্তা বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় একজন দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাগজে সই পেলেই মুক্ত হয়ে যেতে পারে। জুলাই জাতীয় সনদ বলছে ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্ত একটি কমিটির মাধ্যমে হবে, যেখানে ভুক্তভোগী পরিবারের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
এই পরিস্থিতি ঠেকাতে তিনি উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে মত দেন। বলেন, উচ্চকক্ষ থাকলে সংবিধান সংশোধনে বিস্তৃত ঐকমত্য প্রয়োজন হবে। প্রতিটি ভোটের মূল্য বাড়বে।
জরুরি অবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানে জরুরি অবস্থায় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার সুযোগ আছে। জুলাই জাতীয় সনদ বলছে রাইট টু লাইফ কখনো স্থগিত করা যাবে না এবং জরুরি অবস্থা জারিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ থাকতে হবে।
তরুণদের উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভোটারদের বড় অংশ ৩৭ বছরের নিচে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ তাদের। আপনারাই যখন ডাক দিয়েছেন, মানুষ পথে নেমেছে। এখনো আপনারা বলতে পারেন- কেমন বাংলাদেশ চান।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণভোটের মার্কা হচ্ছে ‘টিক চিহ্ন’। যারা মার্কা দেখে বুঝতে চান, তাদের জন্য সেটাই যথেষ্ট। এই সুযোগ হেলায় হারানো যাবে না। অনেক প্রাণের বিনিময়ে আমরা এখানে এসেছি। ফ্যাসিবাদী সরকারকে সরাতে পেরেছি। রাষ্ট্র গঠনের লড়াই অসম্ভব নয়। দৃঢ়ভাবে দাঁড়ালে বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে হ্যাঁ বলবে আমি বিশ্বাস করি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের এমন একটি রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল, যেখানে কাঠামোগত কারণে কোন নাগরিক স্বাস্থ্য, চিকিৎসা শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারগুলোতে বৈষম্যের স্বীকার হবেনা। কিন্তু সেটি হয়েছে, আর একারণেই আমাদের এত ক্ষোভ। বিগত দীর্ঘ সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত অনিয়মের একটা শিকল তৈরি হয়েছিল, এই শিকল ভাঙতে না পারলে এগুলো ঠিক করা যাবে না।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, গণভোট না থাকলে ব্যক্তিগতভাবে আমার নির্বাচনে নিয়ে আগ্রহ থাকতো না। আমি ভোটে দিতে যাবো প্রধানত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে। কারণ আমি মনে করি এটা রক্তের ঋণ।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন- বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের পরিবার, আহত এবং সমন্বয়করা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্রম ডেটা টু ডিসিশন: দ্য ফিউচার অব মার্কেটিং ইন দ্য এজ অব এআই’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নবযুগ মিলনায়তনে মার্কেটিং বিভাগের আয়োজনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে মার্কেটিং খাতের পরিবর্তন এবং ডেটা বা উপাত্ত নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুল মোমেন। এছাড়াও মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি-এর ফুড অ্যান্ড বেভারেজ বিভাগের লিড (ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই প্ল্যানিং) ফয়সাল আলম এবং ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই প্ল্যানার কাজী সামি আল-জাবির।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ফয়সাল আলম বলেন, বর্তমান বিশ্বে কেবল পণ্য উৎপাদন ও বিপণনই শেষ কথা নয়। ভোক্তার আচরণ বুঝতে এবং সঠিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে ডেটা বিশ্লেষণের কোনো বিকল্প নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করে তুলেছে। শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই এই প্রযুক্তিবান্ধব মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
অপর আলোচক কাজী সামি আল-জাবির সাপ্লাই চেইন ও মার্কেটিংয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দেন এবং বিভিন্ন এআই টুল সম্পর্কে বুনিয়াদি জ্ঞান প্রদান করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ করপোরেট জগতে টিকে থাকতে হলে পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন জরুরি।
সেমিনারে মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক সুমনা আক্তার সুমি ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগের ও বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোমেন জানান, শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিল্পখাতের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আলোচকদের কাছ থেকে ক্যারিয়ার ও আধুনিক মার্কেটিং বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জেনে নেন।








