মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

শায়েস্তা খাঁ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৭ বার পড়া হয়েছে

শায়েস্তা খান মুঘল আমলে বাংলার একজন বিখ্যাত সুবেদার বা প্রাদেশিক শাসক ছিলেন। তার খ্যাতি মূলত বাংলার সুবাদার হিসাবে। দু’দফায় সর্বমোট ২২ বছর তিনি বাংলা শাসন করেন। তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা ছিলেন।[৪] প্রথমে ১৬৬৪ থেকে ১৬৭৮ সাল এবং দ্বিতীয় বার ১৬৮০ থেকে ১৬৮৮ সাল। তার শাসনামলে ঢাকার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় এবং এই প্রদেশে মুঘল শাসনের শ্রেষ্ঠ সময় অতিবাহিত হয়। তার শাসনামলে টাকায় ৮ মন চাল পাওয়া যেতো। এর উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলির মধ্যে একটি ছিল মুঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়। ১৬৬০ সালে তাকে মারাঠা রাজা ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশ নিতে পাঠানো হয়েছিল। যাইহোক, তিনি একটি আশ্চর্যজনক আক্রমণে পরাজিত হন এবং তার একটি পুত্রকে হারান। এরপরে তিনি পুনে ত্যাগ করেন এবং তাঁর শিবিরটি আওরঙ্গবাদে স্থানান্তরিত করেন। ইঙ্গ-মুঘল যুদ্ধে তিনি ইংরেজদের পরাজিত করেছিলেন।।[৫][৬]

প্রারম্ভিক জীবন

মির্জা আবু তালিবের পূর্বপুরুষ পারস্য (বর্তমানে ইরান) থেকে আগত এবং মুঘল রাজপরিবারের সাথেও তার সম্পর্ক ছিল। মির্জার বাবা আবুল আসরাফ আসাফ বেগ [(আসাফ খান)-উপাধি] শায়েস্তা খাঁনের দাদা মির্জা গিয়াস বেগ ইতিমাদুদ্দৌলা দু’জনেই মুঘল সাম্রাজ্যের উজির বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাদশাহ শাহজাহান মির্জা আবু তালিব-কে শায়েস্তা খাঁ উপাধিতে ভূষিত করেন। এর কারণ ছিল মুঘল দরবারে তার পরিবারের অবদান ও স্বীকৃতি। শায়েস্তা খাঁ মুঘল সেনাবাহিনী ও দরবারে অনুশীলন গ্রহণ করেন এবং চাকরি করেন। ফলশ্রুতিতে তিনি ক্রমশ পদোন্নতি লাভ করতে থাকেন এবং একাধিক প্রদেশের গভর্নর হন। এছাড়াও তিনি একজন সফল সেনাপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। গোলকন্দার সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তিনি যুবরাজ আওরঙ্গজেবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।[৭] সাম্রাজ্যে অধিষ্ঠিত হবার পর সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে আরো পদোন্নতি দান করে আমির-উল-উমারা বা অভিজাতদের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। আওরঙ্গজেবের আপন ভাই দারা শিকোর বিরুদ্ধে কর্মসূচীর অংশ হিসেবে তিনি তাকে এ পদবি দান করেন। ১৬৬৩ খ্রিষ্টাব্দে মীর জুমলার মৃত্যুর পর শায়েস্তা খাঁ বাংলার সুবাদার পদে নিযুক্ত হন।

মারাঠাদের সাথে সংঘর্ষ

১৬৫৯ সালে আওরঙ্গজেবের মুঘল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, তিনি শায়েস্তা খানকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন, যাতে মুঘলরা বিজাপুরের আদিলশাহির সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি কার্যকর করতে পারে। এই চুক্তির মাধ্যমে আদিলশাহি পূর্বে আহমাদনগর সালতানাত থেকে দখল করা অঞ্চলটি মুঘলদের কাছে হস্তান্তর করেছিল।[৮] যাইহোক, এই অঞ্চলটি মারাঠা শাসক, শিবাজী দ্বারাও তীব্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা হয়েছিল, যিনি ১৬৫৯ সালে আদিলশাহি জেনারেল আফজল খানকে হত্যার পরে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।[৯]

১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে দাক্ষিণ্যাতের শিবাজীকে পরাস্ত করার জন্য শায়েস্তা খাঁকে নিযুক্ত করেন আওরঙ্গজেব। শায়েস্তা খাঁ পুনেতে তাবু স্থাপন করেন এবং কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত মহলে প্রবেশ করেন। পুনে শহরে কোন মারাঠা ব্যক্তির প্রবেশাধিকার ছিল না। একদিন একটি বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য উৎসব পালনের উদ্দেশ্যে বিশেষ অনুমতি গ্রহণ করে শিবাজী এবং তার বাহিনী বরপক্ষ সেজে পুনেতে প্রবেশ করে। রক্ষীদের হত্যা করার পর দেওয়াল ভেঙ্গে তারা ঘরে প্রবেশ করে। শিবাজী নিজেই শায়েস্তা খাঁর মুখোমুখি হন এবং শিবাজীর তরবারির আঘাতে তার বৃদ্ধাঙ্গুলসহ তিনটি আঙ্গুল কেঁটে যায় এবং এর পরিণামে তার সংজ্ঞা হারিয়ে যায়। শায়েস্তা খাঁকে পরবর্তীতে উদ্ধার করে একটি নিরাপদ স্থানে পৌছে দেন তার অধীনস্থ কর্মীরা। পুনের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খাঁকে দুরবর্তী স্থান বাংলায় প্রেরণ করেন।

আরকানদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ

শায়েস্তা খান নির্মীত ছোট কাটারা ও এর মসজিদ (১৮১৭)।
চট্টগ্রাম বিজয়
তারিখ নভেম্বর ১৬৬৫- ২৭ জানুয়ারী ১৬৬৬[১০]
অবস্থান
ফলাফল মুগল বিজয়[১০]
অধিকৃত
এলাকার
পরিবর্তন
চট্টগ্রাম বাংলার সাথে যুক্ত হয়
বিবাদমান পক্ষ
বাংলা
নেদারল্যান্ডসনেদারল্যান্ডস

পর্তুগাল পর্তুগাল

 আরাকান
সেনাধিপতি ও নেতৃত্ব প্রদানকারী
 শায়েস্তা খাঁন
 বুজুর্গ উমেদ খাঁন
 মজলিস খাঁন
 অলি বেগ খাঁন
 ইবনে হোসাইন বেগ
 ফরহাদ খান
 সন্ধা থুধ্ম্ম
শক্তি
 ৯৬০০+সেনা[১১]
৩০০ টি যুদ্ধ জাহাজ[১১]
পর্তুগাল ৪০ টি জাহাজ[১০]
 অনুমান; ১১০০+সেনা
২১৭ টি যুদ্ধ জাহাজ
৩৭৮+ ছোট নৌযান
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি
 হালকা[১০]

বেশ কয়েকটি জাহাজ ডুবে গেছে
১৩৫টি জাহাজ আটক[১০]

বাংলায় আগমনের ফলে শায়েস্তা খাঁকে দুর পাহাড়ী বিদ্রোহী উপজাতীয়দের দমন করতে দেখা যায়। শায়েস্তা খা আরাকান রাজাকে প্রচণ্ড হুমকি হিসেবে গণ্য করেছিলেন কেননা তারা সেনা ও নৌ শক্তিতে সমৃদ্ধ ছিল। তিনি তৎক্ষণাত মুঘল নৌ-বাহিনীর উন্নয়ন শুরু করেন। এক বছরে নৌ-বহরের সংখ্যা প্রায় ৩০০ পৌছে।[১২] তিনি ডাচ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ও সেই সাথে পর্তুগালের সমর্থন অর্জনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালান। ডাচ্ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় শায়েস্তা খাঁর সেনাপতি ইবনে হোসেন আরাকানদের দখলে থাকা সন্দ্বীপ আক্রমণে মুঘলদের নেতৃত্ব দেন।[১৩] আরাকান ও পর্তুগিজদের মধ্যস্থ দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে শায়েস্তা খাঁ এক উল্লেখযোগ্য সুবিধা লাভ করেন।

১৬৬৫ এর ডিসেম্বরে শায়েস্তা খাঁ এক গুরুত্বপূর্ণ সেনা প্রচারণা চালু করেন চট্টগ্রামের বিরুদ্ধে, চট্টগ্রাম তখন ছিল আরাকানদের রাজধানী। সেখানে সাগরে এবং পরবর্তীতে কর্ণফুলীতে প্রচণ্ড নৌ-যুদ্ধ হয়, যাতে পর্তুগিজদের সহায়তায় মুঘলরা জয় লাভ করে। যুদ্ধে হেরে গিয়ে আরাকানী নৌবাহিনীর কিছু সৈন্য পালিয়ে যায় এবং কিছু দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্গটি ১৬৬৬ সালের ২৬শে জানুয়ারি শায়েস্তা খাঁ দখল করেন। সেই সাথে কুচবিহার ও কামপূরায় মুঘল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

বাংলার গভর্নর

আরাকানদের বিরুদ্ধে জয়ের পর তিনি কয়েক হাজার কৃষকদের মুক্তি দানের নির্দেশ দেন। গভর্নর হিসেবে তিনি ইউরোপ, দক্ষিণ পূর্ব এশীয় ও ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেন। তিনি ইউরোপীয়দের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তার অবস্থান সুসংহত করেন।

কীর্তি

শায়েস্তা খাঁ নির্মিত সাত গম্বুজ মসজিদ (১৮১৪)

শেষ সময়ে শায়েস্তা খাঁ ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে ফিরে যান। যাবার আগে তিনি ঢাকাকে স্থানীয় বাণিজ্য, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যান। তার কল্যাণে ঢাকা একটি ছোট দাপ্তরিক কেন্দ্র থেকে বৃহৎ ও উন্নত শহরে পরিণত হয়। শয়েস্তা খাঁ মসজিদটি তার তৈরি একটি সুবৃহৎ কীর্তি যা তার প্রাসাদ সমতলে তৈরি করা হয়েছিল। বাংলা ও মুঘল স্থাপত্য কীর্তির মিশ্রণে তৈরি এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত হয়েছে।

শায়েস্তা খাঁ নির্মিত স্থাপত্য

ঢাকার লালবাগে শায়েস্তা খাঁর সদর দপ্তর ছিল। পুরনো ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তার নির্মিত স্থাপত্য তার স্থাপত্যপ্রীতির পরিচায়ক।

গ্রন্থপঞ্জি

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com