বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে এভাবেই আমাদের শোকগাথা আর শোক সমাবেশ চলতে থাকবে। তাই গণতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। আসুন, গণতন্ত্রকামী মানুষ মিলে আগামীর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিজয়গাথা রচনা করি।
রোববার দুপুরে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ সময় মঞ্চের সামনে জুলাই হতাহত পরিবারের সঙ্গে অতিথি সারিতে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান।
মঞ্চে যখন একের পর এক শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বজন হারানোর বেদনা তুলে ধরছিলেন, তখন পুরো মিলনায়তনে অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। উপস্থিত সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। বাদ যাননি তারেক রহমানও। তিনি বারবার চোখের পানি মুছছিলেন। শহীদ পরিবারের সদস্যরা নিজেদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তারেক রহমান মঞ্চের আসন ছেড়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে গিয়ে তাদের সান্ত্বনা দেন এবং কথা বলেন। কয়েকজন শহীদের মা কাঁদতে কাঁদতে মঞ্চের দিকে এগোলে তারেক রহমান মঞ্চে হাঁটু গেড়ে বসে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। পাশাপাশি জোবাইদা রহমানও শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে গিয়ে
সমবেদনা জানান।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, দল বা কোনো গোষ্ঠীর নয়। এই আন্দোলন ছিল সত্যিকার অর্থে অধিকারহারা গণতন্ত্রকামী মানুষের গণ-আন্দোলন। ২০২৪-এর অর্জনকে সুসংহত করতে চাইলে দেশের নারী-পুরুষ সবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। তিনি বলেন, যারা স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনকে দলীয় স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে পরিণত করতে চায়, তাদের সম্পর্কে স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষকে অবশ্যই সজাগ থাকা জরুরি।
জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশ করে তারেক রহমান বলেন, দুভাবে আমরা গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। এক. রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। দুই. যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সাহসী মানুষগুলো রাজপথে নেমে এসেছিলেন, অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। শহীদ ও আহত পরিবারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আপনারা যখন নিজেদের কষ্ট, ব্যথা ও ত্যাগের কথা ব্যাকুলভাবে তুলে ধরছিলেন, তখন আমি এবং নজরুল ইসলাম খান সাহেব (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য) বসে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, যা তিনি আপনাদের সামনে তুলে ধরেছেন। বিএনপি আগে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল, তখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ইনশাআল্লাহ জনগণের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের দেখভালের জন্য সেই মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি আলাদা বিভাগ তৈরি করা হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, যাকে আমরা হারিয়েছি, তাকে তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু যারা পেছনে রয়ে গেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের সুবিধা-অসুবিধা রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিয়ে দেখভাল করতে হবে। কারণ, আপনারাও মুক্তিযোদ্ধা, আপনারাও যোদ্ধা। তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে এই দেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জীবন দিয়েছেন আর ২০২৪ সালে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য মানুষ আবার রাজপথে নেমেছেন। স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল ৭১-এ আর সেই স্বাধীনতাকেই রক্ষা করা হয়েছে ২০২৪ সালে।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারির সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনসহ শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিরা বক্তব্য রাখেন। এ সময় চোখের সামনে ছেলের খুনি ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু ছেলের খুনিকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন শহীদ শাফিক উদ্দিন আহনাফের মা জারতাজ পারভীন। শহীদ জাহিদের মা ফাতেমা তুজ-জোহারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার সন্তানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আজ ১৭ মাস হয়ে গেছে, কেউ আর আমাকে সেই নামে ডাকে না। আমি কী নিয়ে বাঁচব? তিনি আরও বলেন, এই কঠিন সময়ে বিএনপির পরিবার যদি আমার পাশে না দাঁড়াত, তাহলে কোনোভাবেই আমার ছেলের চিকিৎসা করানো সম্ভব হতো না। আমি বিশ্বাস করি, ইনশাআল্লাহ বিএনপি ক্ষমতায় এলে আমাদের সন্তানদের হত্যার বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই করা হবে।








