বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিতিশীলতার জন্য ভারত কী দায়ী?

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে মতবিনিময়ে পাকিস্তানের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় অশান্তি ও অস্থিতিশীলতার জন্য দিল্লিই দায়ী। দিল্লির আগ্রাসী নীতির কারণেই এই অঞ্চলে শান্তি আসছে না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের আচরণ, ঠিক ইসরাইলের মতো। ঢাকার সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক চায় ইসলামাবাদ।

সম্প্রতি পাকিস্তান সফরে যাওয়া বাংলাদেশ মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি এসব কথা বলেন।

ইসলামাবাদে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, সার্কসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামের সঙ্গে সম্পর্কসহ বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন এই সিনিয়র কূটনীতিক। মতবিনিময় অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দক্ষিণ এশিয়ার অশান্তির মূল কারণ হিসেবে ভারতকে দায়ী করে ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ভারতের আগ্রাসী নীতির কারণেই দক্ষিণ এশিয়া আজ অস্থিতিশীল। দেশটির কারণেই এই অঞ্চলে শান্তি আসছে না। দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের দায়িত্বহীন ও উস্কানিমূলক বক্তব্য-বিবৃতি এই অঞ্চলকে অশান্ত করে তুলছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে রাজনাথ সিং সাম্প্রতিক সময়ে যে ভাষায় কথা বলছেন, তা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভাষা নয়। তারা রীতিমতো হুমকি দিয়ে চলেছেন প্রতিবেশীদের।

তিনি আরও বলেন, তথাকথিত অপারেশন সিন্দুরের নামে তারা যা করতে চেয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়ে ভারত এখন রীতিমতো দিশাহারা। বিশ্বের কাছে দিল্লির মুখোশ খুলে পড়েছে। এ ছাড়া অপারেশন সিন্দুরের বিরুদ্ধে আমাদের পাল্টা জবাবটা যে এতটা তীব্র হবে, তা তারা ভাবতেও পারেনি।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঠিক ইসরাইলের মতো। ইসরাইল তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করে, ভারতের আচরণও ঠিক সেই ধরনের। কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেই তাদের সুসম্পর্ক নেই।

ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই কূটনীতিক বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক কেমন ছিল- তা সবারই জানা। এটা নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। ৫ আগস্টের গণঅভুত্থানের পর আমাদের সামনে সম্পর্ক উন্নয়নের এক নতুন সুযোগ এসেছে। এখন আমাদের প্রধান কাজ একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক নিশ্চিত করা। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান যেসব চুক্তি রয়েছে সেগুলোকে কার্যকর করা। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে- এটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। শুরু হয়েছে উচ্চপর্যায়ের সফর। পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে একটি টেকসই ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার পাশাপাশি ঐতিহাসিক ইস্যু নিয়ে আমরা কথা বলতে চাই।

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়ে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির কড়া সমালোচনা করে এই সিনিয়র কূটনীতিক বলেন, দুদেশ তাদের পারস্পরিক স্বার্থকে বিবেচনা করে সম্পর্ক গড়বে। এখানে তৃতীয় দেশের কোনো বক্তব্য থাকতে পারে না। কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা হলো যখনই পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়াতে চেয়েছে তখনই ভারত এটাকে তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে। ভারতের এ এক অদ্ভুত আচরণ যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ভারতের এই ধরনের মনোভাবের কারণেই কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেই তাদের সুসম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, প্রথমে একটি কথা স্পষ্ট করতে চাই- বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো ধরনের নিরাপত্তা ইস্যু নেই। দুদেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রশিক্ষণ বিনিময়সহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগকে অতীতে কাজে লাগিয়েছে দুদেশ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সহযোগিতা চাইলে পাকিস্তান সেই সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য দুদেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-পাকিস্তান-চীন ত্রিদেশীয় সহযোগিতা ফোরামের বিষয়ে তিনি বলেন, এই ধরনের সহযোগিতা বিভিন্ন দেশের মধ্যে হয়ে থাকে। আমরা পারস্পরিক স্বার্থে এই ইস্যুতে কথাবার্তা বলছি। এটি কার্যকর হলে আমরা সবাই লাভবান হতে পারব। এখানে এই অঞ্চলের অন্য দেশও যুক্ত হতে পারবে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-পাকিস্তান-চীন সহযোগিতা ফোরাম তৃতীয় কোনো দেশকে টার্গেট করে করা হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সার্ককে কার্যকর করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারতের কারণে সার্ক আজ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সার্কই এই অঞ্চলের মানুষের টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম। আমরা চাই সার্কের সব দেশ তাদের নিজেদের স্বার্থেই আবার সার্ককে কার্যকর করুক। সার্কসহ কোনো আঞ্চলিক ফোরাম কোনো নির্দিষ্ট দেশের কাছে জিম্মি হতে পারে না।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে পাকিস্তানের সহযোগিতার বিষয়ে এই সিনিয়র কূটনীতিক বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যার সমাধানে পাকিস্তান তার করণীয় সবই করছে। এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ এবং ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যেসব প্রস্তাব আনা হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই পাকিস্তান এনেছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সব ধরনের সহযোগিতা নিয়ে ঢাকার পাশে থাকবে ইসলামাবাদ।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তব পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র এখন উপলব্ধি করছে। সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের মদদ নেই, বরং পাকিস্তানই যে সন্ত্রাসবাদের শিকার সেই বিষয়টি এখন বুঝতে পারছে যুক্তরাষ্ট্র। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে।

হঠাৎ করে তালেবান সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, কাবুল কার সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে- তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা চাই- টিটিপিসহ যেসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী আক্রমণ করছে কাবুল তাদের ইসলামাবাদের হাতে তুলে দিক। কোনো দেশের উস্কানিতে তালেবান সরকার যদি পাকিস্তানে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায়, তা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

এদিকে বাংলাদেশ মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে পৃথক মতবিনিময়ে পাকিস্তানের অন্যতম থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজের (আইআরএস) প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রদূত জওহর সেলিম বলেন, ভারতের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার যে সম্ভাবনা রয়েছে- তা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশের বাস এই অঞ্চলে। অথচ অঞ্চলটি বিশ্ব অর্থনীতির মাত্র ৫ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। সার্ক কার্যকর থাকলে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যেত। কিন্তু সার্কতো এই মুহূর্তে একপ্রকার অকার্যকর। আমরা জানি, ভারত ছাড়া সার্ক সফল হবে না। ভারতের উচিত তার জনগণের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সার্কের পুনরুজ্জীবনে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ-পাকিস্তান, নেপাল-বাংলাদেশ, নেপাল-পাকিস্তান, পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কাসহ সব প্রতিবেশীর মধ্যে একটি সুসম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে কারও কোনো সুসম্পর্ক গড়ে উঠছে না। তাই এই অঞ্চলের দেশগুলো চীনের দিকে ঝুঁকছে। চীন এই অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করে না। দেশটির এই নীতি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীনকে সুবিধাজনক অবস্থায় রেখেছে। অন্যদিকে ভারত তার প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার পাশাপাশি তার নিজস্ব নীতি তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত সেলিম বলেন, এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশ কমবেশি সন্ত্রাসবাদের শিকার। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সন্ত্রাসবাদকে ইসলামের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হচ্ছে। হিন্দু বা খ্রিস্টান সন্ত্রাসবাদ বলে কেউ কিছু বলে না। অথচ, সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে ইসলামকেই টার্গেট করা হচ্ছে। ইসলাম কখনোই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে না। ইসলামের নামে যারা সন্ত্রাস করছে তাদের একমাত্র পরিচয়Ñ তারা সন্ত্রাসী, তাদের আর কোনো পরিচয় নেই।

কায়েদ-এ আজম ইউনিভার্সিটির ডিফেন্স এন্ড স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিস বিভাগের শিক্ষক ও বিশিষ্ট ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. সালমা মালিক বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, দুদেশের পারস্পরিক স্বার্থে একে অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি দুদেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগসহ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতাটা বিশেষভাবে জরুরি।

তিনি বলেন, দুদেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে সাধারণ মানুষকে যেকোনো বিষয়ে কথা বলা বা প্রশ্ন তোলার সুযোগ দিতে হবে। ’৭১-এর ঘটনার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতেও আমাদের খোলামেলা কথা বলা উচিত। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্কটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন প্রফেসর সালমা মালিক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যখন যে সরকারই থাকুক না কেন সেই সরকারের সঙ্গে কাজ করবে পাকিস্তান। তবে দুদেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে সমমর্যাদা ও সমঅধিকার।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com