হঠাৎই একটি গাড়ির ধেয়ে আসার শব্দে সচকিত হয়ে পেছনে তাকালাম। ড্রাইভার আমাদের পোশাক দেখেই গাড়ি থামাল। জিজ্ঞেস করল আমরা লতিফ সিদ্দিকীকে দেখেছি কি না। আমরা খবর জানতাম যে লতিফ সিদ্দিকী হেঁটেই রওনা হয়েছেন টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য। গাড়িটা এসেছিল লতিফ সিদ্দিকীকে নেওয়ার জন্য।
আধাঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম টাঙ্গাইল শহরে।
২.
টাঙ্গাইল স্বাধীন হয়েছে ১১ ডিসেম্বর। ওই দিনই ইন্ডিয়ান ছত্রীসেনারা যুদ্ধবিমান থেকে প্যারাশুট দিয়ে নামেন। তাঁরা প্যারাট্রুপার। তখন মনে হয়েছে অগণন তারা। পরের দিনই দেখলাম, এলেন কর্নেল শ্যাম সিং বাবাজি। তার পরের দিন এলেন জেনারেল অরোরা। সার্কিট হাউসে বসে তাঁরা প্ল্যান করলেন। বািচত হিন্দিতে হচ্ছে, তাই বুঝতে পারছিলাম না। যদিও হেডকোয়ার্টার্সের মুক্তিযোদ্ধা, তাই আমাদের পজিশন বেশ ওপরে ছিল। আমরা অনায়াসেই ওই প্ল্যানের অংশীদার হলাম। কাদের সিদ্দিকীই প্ল্যানের মূল হোতা, তিনি মিরপুরের আমিনবাজারের লোহার ব্রিজের কথা বলছিলেন।
জেনারেল অরোরা, কর্নেল বাবাজি এবং আরো ভারতীয় উচ্চপদস্থ সেনারা সামনে, আমরা পেছনের সামরিক যানে উঠেছি। মিরপুরের লোহার পুলের কাছে ওরা যেতে পারলেন, আমরা পেছনেই পড়ে রইলাম। আমিনবাজারের লোহার পুলে পাকিস্তানিরা ছিল না। ওখান থেকেই ওয়্যারলেসে কথা বলছিলেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় জেনারেল। ঠিক হয়েছিল কোথায় আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর হবে। রেসকোর্সে করা হয়েছিল আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার আয়োজন। তা-ই হলো। কিন্তু না কাদের সিদ্দিকী, না মেজর জিয়া, না এ কে খন্দকার, না মেজর এ টি এম হায়দার, না মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানি—কাউকেই সেই টেবিলে ডাকা হয়নি সেদিন। অথচ কলকাতা থেকে হেলিকপ্টারে করে বেসামরিক পোশাকে এ কে খন্দকারকে আনা হয়েছিল। আগরতলা বা সিলেটের সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ওসমানীকে আনা হয়নি। উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকেই টেবিলের কাছে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। শুধু পাকিস্তানি জেনারেল ও ভারতীয় জেনারেল বসে স্বাক্ষর করলেন।
৪.
যুদ্ধটা আমরাই শুরু করেছিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের লক্ষ্যে; সেই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য। কেননা, মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন থেকে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডের নাইটাপাড়ায় মুক্তিসেনাদের প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়ে দখলদার পাকিস্তানি সেনারা। আমাদের অপটু যোদ্ধারা বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি বটে, তবে আমাদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার দুর্বার বাসনা জাগিয়েছিল ওই নাইটাপাড়ার যুদ্ধ।
আমরা পাহাড়ি এলাকায় সংগঠিত হলাম। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যাঁরা ইপিআর ও সেনা সদস্য ছিলেন, সঙ্গে কাদের সিদ্দিকী ও খন্দকার ফজলুর রহমান (ব্রিগেডিয়ার ফজলু) ট্রেইনার হিসেবে বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁদের ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে সৈনিকজীবনের ট্রেনিং। নাম না-জানা আরো সৈনিক ছিলেন, যাঁরা কাদেরিয়া বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ছিলেন ঝনঝনিয়া গ্রামের লাল্টু। তিনিও সেনাবাহিনীতে ছিলেন আর ওই গ্রামেরই দক্ষিণ পাড়ার রহম, ছিলেন দেওপাড়ার রিয়াজ—তাঁরা কম্পানি কমান্ডার পদে আসীন ছিলেন।
আর মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি ছিল একেবারে তরুণপ্রাণ স্কুল ও কলেজপড়ুয়া ছাত্র আর চাষারা। আর ছিল কোটি কোটি উৎপাদক মানুষের সমর্থন। ছাত্র-শিক্ষক-কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ, যারা চেয়েছিল মুক্ত হতে শাসন ও শোষণের নাগপাশ থেকে।
৫.
জনযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শাসনের নিগড় থেকে, শোষণের জাঁতাকল থেকে মেহনতি মানুষের মুক্তি। সেই মুক্তির রাজপথের নাম গণতন্ত্র। ওই গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে এ দেশের লাখ লাখ মানুষ। ধর্ষিত হয়েছে হাজার হাজার মা-বোন-জায়া। তাদের জীবন ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, তার লক্ষ্য কি পূরিত হয়েছে গত ৫৪ বছরে?
এর একটাই উত্তর—না, হয়নি।
কেন হয়নি?
শেখ মুজিবের মতো একজন নিরলস রাজনৈতিক নেতা, যিনি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি কেন বিজয় অর্জনের পর ক্ষমতায় বসলেন পাকিস্তানি ও ব্রিটিশদের সৃষ্ট ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের শৃঙ্খল প্রশাসনে? ওই প্রশাসন ব্যবস্থায় তো গণতান্ত্রিক শাসনের ছোঁয়াও ছিল না। সেটা কি তিনি বুঝতে পারেননি?