আনন্দ মোহন কলেজ বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরে অবস্থিত একটি সরকারি মহাবিদ্যালয়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮০ সালে আনন্দমোহন বসু দ্বারা ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।[১][২][৩] বর্তমানে এটি ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালু আছে।[৪][৫] ২০২৪ সালের তথ্যানুসারে এখানে মোট ২৪,৯৮৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।[৬]


১৮৭৮ সালে কলকাতার সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠার পর, আনন্দমোহন বসু তার নিজ শহর ময়মনসিংহে এর একটি শাখা খোলার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৮০ সালে তার বাসভবনে ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউশন নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করে, যা ১৮৮৩ সালে সিটি কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিতি পায়।[৭] ১৯০১ সালে সিটি কলেজিয়েট স্কুল কলেজ বিভাগ চালু করে এবং এর নামকরণ করা হয় ময়মনসিংহ সিটি কলেজ। পরবর্তীতে, ১৯০৮ সালের ১ জানুয়ারি কলেজ বিভাগের কার্যক্রম কলেজ রোডে স্থানান্তরিত হয় এবং আনন্দমোহন বসু নামানুসারে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়। ১৯৬৪ সালে কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়।[৮][৯] ১৯০৮ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আনন্দ মোহন কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়।[১০] বর্তমানে এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত আছে।

কলকাতা উচ্চ আদালতের বিচারক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতের অন্যতম বিচারক রাধা বিনোদ পাল ১৯১১-২০ সালে এই কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ইতিহাসবিদ প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম এবং লেখক ড. সফিউদ্দিন আহমদ আনন্দ মোহন কলেজে শিক্ষকতা করেন।[১০]

ক্যাম্পাসটি ময়মনসিংহ শহরের কাঁচিঝুলি এলাকায় অবস্থিত। কলেজটি মোট ১৬.৮০ একর জায়গা নিয়ে গঠিত, যেখানে রয়েছে দ্বিতল একাডেমিক ভবন, আধুনিক গ্রন্থাগার, অডিটোরিয়াম, শহীদ মিনার, পৃথক ছাত্র-ছাত্রী মিলনায়তন, এবং প্রশাসনিক ভবন। ক্যাম্পাসের মধ্যে রয়েছে প্রশস্ত খেলার মাঠ, পুকুর, বোটানিক্যাল গার্ডেন, এবং আধুনিক গবেষণাগার।[১১]
ছাত্রছাত্রীদের জন্য কলেজে ৩টি ছাত্র ও ২টি ছাত্রী হোস্টেল রয়েছে। এছাড়াও শিক্ষকদের আবাসিক ভবন, অতিথি ভবন, ব্যাংক বুথ, পোস্ট অফিস, মসজিদ, এবং বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের সুবিধা রয়েছে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণ তহবিল, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। কলেজ প্রাঙ্গণের ভেতরে একটি পুকুরও রয়েছে।[১১]
বর্তমানে এই কলেজে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখায় শিক্ষা প্রদান করা হয়। এছাড়া, ২০টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান), ১৮টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ফাইনাল এবং স্নাতকোত্তর প্রিলিমিনারি কোর্স চালু আছে। স্নাতক (পাশ) কোর্সের অনুমতি থাকলেও পাঠদান বন্ধ আছে। ২০২৪ সালের তথ্যানুযায়ী এখানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ২০২২ জন, স্নাতক (সম্মান) স্তরে ১৩,৯৪৫ জন এবং স্নাতকোত্তর স্তরে ৯০২০ জন মিলে মোট ২৪,৯৮৭ জন শিক্ষার্থী অধ্যায়নরত আছে।[৬]
| স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাঠদানের অনুষদ ও বিভাগ | ||||
|---|---|---|---|---|
| অনুষদ | বিভাগ | স্নাতক | স্নাতকোত্তর ফাইনাল | স্নাতকোত্তর প্রিলিমিনারি |
| বিজ্ঞান অনুষদ | গণিত | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| পদার্থ বিজ্ঞান | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| রসায়ন | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| জীবন ও পৃথিবী বিজ্ঞান অনুষদ | প্রাণিবিদ্যা | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| উদ্ভিদবিদ্যা | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| ভূগল ও পরিবেশ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| কলা অনুষদ | বাংলা | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| ইংরেজি | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| ইতিহাস | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| দর্শন | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| ইসলামিক শিক্ষা | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| ইসলামিক ইতিহাস এবং সংস্কৃতি | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ | রাষ্ট্রবিজ্ঞান | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| সমাজ বিজ্ঞান | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| সমাজকর্ম | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| অর্থনীতি | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| বাণিজ্য শিক্ষা অনুষদ | হিসাব বিজ্ঞান | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| ব্যবস্থাপনা | হ্যাঁ | হ্যাঁ | হ্যাঁ | |
| মার্কেটিং | হ্যাঁ | না | না | |
| ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং | হ্যাঁ | না | না | |
২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১২,৭০১ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে পাস করেছে ১১,৬৯৬ জন এবং ফেল করেছে ১,০০৫ জন। ৪,২৫১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ (এ+) অর্জন করেছে। এই সময়ে গড় পাসের হার ছিল ৯২.০৯%, এবং জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার ছিল ৩৩.৪৭%।[১২]
২০২৪ সহপাঠী কলেজ র্যাংকিং অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় পর্যায়ে ৬৬তম, ময়মনসিংহ বিভাগ ও জেলায় ৩য় স্থানে অবস্থান করেছে।[১২]
২০১৭ ও ২০১৮ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ র্যাংকিংয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশের সেরা পাঁচটি কলেজের মধ্যে স্থান লাভ করে।[১৩]