দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি দুই দফায় ২৭২ আসনে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে। কিন্তু এখনো শরিক দলের প্রার্থীদের আসন ছাড়েনি দলটি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে যেসব দল যুগপৎ আন্দোলন করেছে, তারা অসন্তুষ্ট। বিশেষ করে শরিকদের শীর্ষ নেতারা যেসব আসনে নির্বাচন করতে চান, সেসব আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ও দূরত্ব বেড়েছে।
যদিও বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং মিত্রদের অবমূল্যায়ন করেছে, কিন্তু আমরা সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাই না। আমরা যথাযথ সম্মান-মর্যাদা চাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ আসনের জন্য ক্ষুব্ধ না, আমাদের আক্ষেপের জায়গাটা হচ্ছে প্রার্থী ঘোষণার আগে আমাদের সঙ্গে ন্যূনতম সৌজন্যতামূলক আলোচনাটুকুও করেনি বিএনপি। তার পরও আমরা বিএনপিকে বন্ধু মনে করছি, আমরা মনে করি বন্ধু ভুল করতে পারে এবং আমরা চাই তারা ভুল শুধরে নিক।’
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ‘আমরা যখন যুগপৎ আন্দোলনে ছিলাম এবং পরবর্তী সময়ে আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, একসঙ্গে নির্বাচন করব এবং জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। আমরা মনে করি বিএনপির শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচন এবং সরকার গঠন করলে সেখানে সঙ্গে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দলটি। এমনকি মিত্র দলগুলোর অনেককেই তাঁদের প্রত্যাশিত নির্বাচনী আসনে প্রচার-প্রচারণা ও নির্বাচনী কার্যক্রম চালানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। তবে গত ৩ নভেম্বর ২৩৬টি এবং ৪ ডিসেম্বর আরো ৩৬টি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার মাধ্যমে মিত্রদের অনেক আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। ফলে বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মিত্রদের সঙ্গে টানাপড়েন শুরু হয়েছে।’
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন। একইভাবে ১২ দলীয় জোট, সমমনা জোট, গণতন্ত্র মঞ্চ ও ইসলামী ঘরানার দলগুলোও বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে ক্ষুব্ধ। তবে তারা এখনই প্রকাশ্যে কিছু বলতে চায় না, শেষ পর্যন্ত বিএনপি কী করে সেটি দেখার অপেক্ষা করছে তারা।
মিত্র দলগুলোর অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েই বিএনপির পক্ষ থেকে শরিক দলগুলোকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, নির্বাচন একই সঙ্গে করবে এবং সরকার গঠন করলে জাতীয় সরকার হবে। কিন্তু দুই দফায় ২৭২টি আসনে বিএনপি যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে সেখানে শরিকদের অনেকের প্রত্যাশিত আসনেও দেওয়া হয়েছে ধানের শীষের প্রার্থী। এর মধ্যে নড়াইল-২ আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, ঝালকাঠি-১ আসনে লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে ১২ দলীয় জোট নেতা ও জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, ঢাকা-৮ অথবা ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।
তবে শরিকদের ক্ষোভ ও হতাশার মধ্যেই যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের সঙ্গে ‘আসন সমঝোতা’ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি। গত মঙ্গলবার রাতে বিএনপির গুলশানের কার্যালয়ে ছয়দলীয় মোর্চা গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে দলটির নেতাদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য আকবর খান উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষে ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ তিন নেতা। তাঁরা দীর্ঘ সময় জোটের মনোনয়নের ব্যাপারে আলোচনা করেন।
সাইফুল হক বলেন, ‘বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, সেখান থেকে যদি সরে আসে, সেটার দায়-দায়িত্ব বিএনপির। আমরা বিশ্বাস করতে চাই না, একলা চলো নীতি নিয়ে বিএনপি আত্মঘাতী পথে যাবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান গত মঙ্গলবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরই মধ্যে ২৭২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি আসনগুলোতেও শিগগিরই ঘোষণা করা হবে। তবে বিগত দিনে যেসব শরিক দল আমাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করেছে, তাদের প্রতি আমরা দায়বদ্ধ। তাদেরকেও আসন ছাড় দেওয়া হবে।’