এদিকে এই অনিশ্চতার মধ্যে গতকাল বুধবার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব ঘোচাতে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে ৯টি রাজনৈতিক দল। এ উদ্যোগে গণতন্ত্র মঞ্চের ছয়টি দলের সঙ্গে আছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও গণঅধিকার পরিষদ। গতকাল বুধবার দুপুরে এসব দলের নেতারা সংকট সমাধানে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন।
গত ২৮ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ ও এর বাস্তবায়ন সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তাস্তর করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, যা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সংস্কার সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তোলে বিএনপি। দুটি বিশেষ দলের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে কমিশন সুপারিশ করেছে বলে অভিযোগ করে দলটি।
এ বিষয়ে গতকাল বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য এক সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ পর অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো যাবে।
উপদেষ্টা পরিষদের প্রস্তাব নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের প্রস্তাবকে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত মনে করছে বিএনপি। একই দিন ভোট হলে সময়, ব্যয় ও প্রশাসনিক ঝামেলা কমবে; একই সঙ্গে সনদের বিষয়ে জনগণের রায়ও স্পষ্ট হবে। সরকারকেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, দলের পক্ষ থেকে আমরা আমাদের মতামত দিয়েছি। সংস্কার প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’গুলো স্পষ্ট করতে হবে।”
এদিকে জামায়াতের সিনিয়র প্রচার সহকারী মুজিবুল আলম গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা শেষে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনী কাঠামো, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের বিষয়ে একটি ‘সমঝোতামূলক রূপরেখা’ তৈরির লক্ষ্যে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার লক্ষ্যে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সরকার গড়িমসি করছে, যা জাতির জন্য উদ্বেগজনক। কেউ কেউ গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠানের মতো একটি ধারণা পোষণ করছেন। একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে গণভোটের গুরুত্ব মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। এটি গণভোট প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তায় ফেলবে। কারণ, জাতীয় নির্বাচনে কোনো ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত হলে গণভোটও স্থগিত হয়ে যাবে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলেছে, সরকার এই বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর কাঁধে তুলে দিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে চাইছে। একই সঙ্গে অহেতুক সময় নষ্ট করছে। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, সরকার আবারও রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে বল ঠেলে দিয়েছে। এটা আসলে তারা গা বাঁচানোর একটা পরিকল্পনা নিয়েছে।
গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, জুলাই সনদ এবং সনদের আইনি ভিত্তি হিসেবে গণভোটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্য ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ঐকমত্য কমিশন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায় রয়েছে বলে মনে করে গণতন্ত্র মঞ্চ। এই অচলাবস্থার মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টির দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে সরকার দায়মুক্তির চেষ্টা করছে। গণতন্ত্র মঞ্চ মনে করে, গণভোটের তারিখ নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের। অথচ তারা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে এই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সৃষ্ট সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ প্রণয়নের ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’গুলোকে যেভাবে লিপিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, ঐকমত্য কমিশন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর সই করা সনদ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়ার মধ্যে নীতিগত পার্থক্য রয়েছে। এই বিষয়গুলো উদ্ভূত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। সর্বশেষ সরকারের পক্ষ থেকে দলগুলোর ঐকমত্য তৈরির জন্য সাত দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এটা একদিকে যেমন প্রতারণার শামিল, অন্যদিকে সরকারের স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রকাশ। এই পরিস্থিতিতে সরকারকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাম গণতান্ত্রিক জোট সরকারের আহবান প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানান বাম জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনার পর জুলাই সনদের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনা করে একটা অভিন্ন সুপারিশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা অবাস্তব ও কাল্পনিক। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেটা আদৌ কি সম্ভব? বিএনপি, জামায়াত ও বামদের আদর্শ কি এক? তারা কি চাইলেই এক জায়গায় আসতে পারবে? গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে অনৈক্য, বিভাজন ও বিভক্তি সৃষ্টি করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তাদের কারণে নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে যেসব প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে, সেগুলো নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক আদেশ জারি ও গণভোট, অবান্তর বলে মন্তব্য করেন তিনি।
৯ দলের আলোচনায় গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, গণঅধিকার পরিষদের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন, মুখপাত্র ফারুক হাসান, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদারুল ভূঁইয়া প্রমুখ অংশ নেন।