সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্দেশ করে আদালত বলেছেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পেরিয়ে গেছে অথচ এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত শেষ করতে আর কত বছর লাগবে?’
গতকাল বৃহস্পতিবার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ ফের সময় চাইলে বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ উষ্মা প্রকাশ করে এ মন্তব্য করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ।মামলার বাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। শুনানিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘দীর্ঘ সময়েও তদন্ত শেষ না হওয়ায় আমরা বাইরে মুখ দেখাতে পারছি না। সবাই জানতে চান, তদন্ত কবে শেষ হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই এই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন। রাজনৈতিক সরকার এলে তদন্ত আরো পিছিয়ে যেতে পারে।’এর পর অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ আদালতকে জানান, সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। প্রতিবেদন রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দাখিল করা হয়েছে।
এর আগে গত ২২ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সকে আরো ছয় মাস সময় দিয়েছিলেন। এবারও আদালত শেষবারের মতো ছয় মাস সময় বাড়ালেন।আদেশের পর আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ‘টাস্কফোর্স গঠনের পর প্রায় এক বছর পার হয়ে গেছে। প্রথমে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছিল, পরে আরো ছয় মাস। কিন্তু এখনো তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেননি। আজ আদালতে একটি ছোট নথি জমা দিয়েছে, যা আমরা দেখতেও পারিনি। আমি আদালতের কাছে টাস্কফোর্স সদস্যদের হাজির করার নির্দেশনা চেয়েছিলাম। রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি জানিয়ে আবার সময় চায়। আদালত শেষবারের মতো ছয় মাস সময় দিয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘কি আশ্চর্য! হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১২-১৩ বছর আগে, এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। বিচার তো আরো দূরের কথা। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।’
২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব র্যাবকে দেয়। গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপক্ষ ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে আবেদন করে ওই আদেশ সংশোধনের অনুরোধ জানায়। শুনানি শেষে আদালত আবেদন মঞ্জুর করে স্বরাষ্ট্রসচিবকে নির্দেশ দেন, বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞদের নিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করতে এবং ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে।
এরপর টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। গত ৬ এপ্রিল ছিল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত দিন। তবে ২২ এপ্রিল বিষয়টি আদেশের জন্য ওঠে। তখন রাষ্ট্রপক্ষ তদন্ত শেষ করতে আরো ৯ মাস সময় চায়। আদালত ছয় মাস সময় দেন। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরে আদালত সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শেষবারের মতো আরো ছয় মাস সময় দেন।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে ভাড়া বাসায় খুন হন বেসরকারি টেলিভিশন মাছরাঙার বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং তাঁর স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। এ ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করেন। গত ১১ আগস্ট ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়িয়ে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেন। এ নিয়ে এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ১২০ বার বাড়ানো হলো।