মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সাপের উপদ্রব

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার উত্তরার একটি বহুতল ভবনের পঞ্চম তলা। ভোররাতে ঘুম ভাঙতেই পরিবারের এক সদস্য দেখলেন, বিছানার পাশে প্যাঁচানো অবস্থায় একটি সাপ। আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন পরিবারের সবাই। পরে মোবাইল ফোনে বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে জানানো হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সংস্থাটির রেসকিউ টিম এসে খৈয়া গোখরা সাপটি উদ্ধার করে।

বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে সাপের আনাগোনা ও সাপের ছোবলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ইট-পাথরের নগরী রাজধানীতে এমন ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত। বনশ্রী, মেরাদিয়া, মিরপুর, আফতাবনগর, মোহাম্মদপুর, বছিলা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, আজমপুর, উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর– এমনকি নিকেতন ও ক্যান্টনমেন্টের মতো অভিজাত এলাকায়ও সাপের দেখা মিলছে। বাসিন্দারা আকস্মিকভাবে সাপ দেখে আতঙ্কিত হচ্ছেন। উদ্ধার হওয়া সাপগুলোর মধ্যে ভয়ংকর বিষধর খৈয়া গোখরা (ইন্ডিয়ান কোবরা), পদ্মগোখরা বা মনোকেল্ড কোবরা, ওয়ানস ক্রেট ও রাসেল ভাইপার উল্লেখযোগ্য। এখন পর্যন্ত সাপের দংশনে মিরপুরে একটি বাসার তিন তলায় একজন নারী আহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব বলছে, গত তিন মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩২২টি সাপ উদ্ধার হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন উদ্ধার হয়েছে তিনটি। উদ্ধার সাপগুলোর ৩১৯টিই বিষধর।

অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ বলেন, আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সব সময় প্রাণীর সুরক্ষায় কাজ করি। সাপ ও বন্য প্রাণী উদ্ধারে কাজ করি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা। তিনি আমাদের কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন কারও বাড়িতে যত রাতেই সাপ পাওয়ার খবর আসে, যেন আমরা ছুটে যাই। আমরা তাঁর নির্দেশনা মেনেই সব সময় সাপ উদ্ধার কাজে নিয়োজিত আছি। এ থেকে মানুষ উপকৃত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকায় আমরা যেসব সাপ উদ্ধার করেছি, তার বেশির ভাগই পদ্মগোখরা বা মনোকেল্ড কোবরা। এদের পানিপ্রীতি আছে। আগে যেসব জায়গায় জলাশয় ছিল– বনশ্রী, আফতাবনগর, উত্তরখান, বছিলা– এখন সেখানে ভবন আর রাস্তা। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে গর্ত ও জলাধার ভরে গেলে সাপ শুকনো জায়গা খুঁজে মানুষের বাড়িতে ঢুকে পড়ে।
তিনি জানান, খৈয়া গোখরার প্রজনন মৌসুম ছিল দুই মাস আগে। অক্টোবর মাস পদ্মগোখরার প্রজননকাল। তাই এই সময় ডিম ফোটার পর বাচ্চা সাপ বের হচ্ছে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে পাঁচ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। তাই এখনই সবচেয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বাচ্চা সাপেও ভয়ংকর বিষ আছে। ঢাকায় এখন পদ্মগোখরা সাপ সবচেয়ে বেশি।

আদনান আজাদ বলেন, রেসকিউ কলগুলো বেশির ভাগ আসে গভীর রাতে– রাত ২টা থেকে ৫টার মধ্যে। সাপ নিশাচর প্রাণী, তাই রাতে চলাচল করে। আমাদের টিম প্রায় প্রতি রাতে কল পায়। একটি ভবনের নবম তলা থেকেও সাপ উদ্ধার করতে হয়েছে।

ঢাকার উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর, বনশ্রী, বছিলা ও আফতাবনগর– নতুন গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্পগুলোতে সাপ দেখার ঘটনা বেশি। কারণ, এসব এলাকায় জলাধার ও সবুজ অঞ্চল একেবারে বিলীন হয়ে গেছে।
অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বনশ্রীর একটি কারখানা থেকে বিষধর গোখরা, জুনে মোহাম্মদপুরের নবম তলা থেকে তিনটি সাপ, একই মাসে উত্তরার পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটে বিষধর গোখরা, আগস্টে কাফরুলে একটি বহুতল ভবন ও বছিলা থেকে আরও কয়েকটি সাপ উদ্ধার করা হয়। সেপ্টেম্বরে নিকেতন থেকে মাঝরাতে উদ্ধার হয় গোখরা। চলতি মাসে আবার বনশ্রীর একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় বিশাল আকারের গোখরা সাপ। সংস্থাটি বলছে, অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর আশঙ্কায় এই উদ্ধার অভিযানগুলোর অনেকটাই ফেসবুকে প্রকাশ করা হয় না।
আদনান আজাদ বলেন, নগরে আমরা উচ্ছিষ্ট খাবার যেখানে-সেখানে ফেলি, বিশেষ করে দুই বাড়ির ফাঁকে ফেলা খাবার ইঁদুরকে টেনে আনে। ইঁদুরের পেছনে আসে সাপ। প্রথমে গলিতে ঢোকে, পরে বাসার ভেতরেও ঢুকে পড়ে। অনেক এলাকায় এখন দুই ভবনের ঘিঞ্জি ফাঁকা স্থানে সাপের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে। একবার সাপ ঢুকে পড়লে ইঁদুরের চলাফেরা থাকায় তারা সেখানেই থেকে যায়। আমরা পাঁচতলা ও সাততলা ভবনে সাপকে ডিম পাড়তে দেখেছি।

তিনি বলেন, যেসব বহুতল ভবনে সাপ পাওয়া গেছে, সেসব বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া গাছ ছিল। অনেকেই শখ করে ভবনের লতানো গাছ লাগিয়েছিলেন। আমরা অনুমান করছি সাপ গাছ বেয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের রেসকিউ টিম কিছু সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা; ঘাস-ঝোপ কাটা; উচ্ছিষ্ট খাবার যত্রতত্র না ফেলা; বাথরুম, স্টোররুম বা রান্নাঘরের নিচে অন্ধকার ও ভেজা জায়গায় নজর দেওয়া; সাপ দেখা গেলে নিজে কিছু না করে রেসকিউ টিমে খবর দেওয়া। অ্যাসোসিয়েশনের স্বেচ্ছাসেবীরা ২৪ ঘণ্টা ফোনে সাড়া দেন। তারা সাপ উদ্ধার করে বন বিভাগকে জানিয়ে মানববিহীন চর অঞ্চল ও বিভিন্ন বনে অবমুক্ত করেন।
এদিকে, রাজধানীর সব হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা বা অ্যান্টিভেনম নেই। ফলে রাজধানী ও আশপাশের এলাকার মানুষ যদি না জানেন কোথায় গেলে চিকিৎসা মিলবে, তাহলে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে।

খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে, হাতেগোনা দু-একটি হাসপাতালেই আছে সাপে কাটার চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা হয় এবং পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম আছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, সাপ প্রকৃতির খাদ্যচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইঁদুর ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন করে কৃষি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করে তারা। কিন্তু নগরায়ণের কারণে বন, ঝোপঝাড়, জলাশয় হারিয়ে তাদের প্রাকৃতিক আশ্রয় কমে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, আমরা সাপকে ভয় পাই, কিন্তু এরা শহর বা গ্রামের ক্ষতি করে না; বরং ইঁদুর দমন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। সমস্যা হচ্ছে– আমরা তাদের বাসস্থান কেড়ে নিচ্ছি। পরিকল্পিত নগরায়ণ হলে মানুষের সঙ্গে প্রাণ-প্রকৃতির সহাবস্থান সম্ভব। তবে বর্তমানে শহরের আগ্রাসী বিস্তারের কারণে সাপগুলোকে মানুষের আবাসে আসতেই হচ্ছে। তিনি বলেন, সাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কার্বোলিক এসিড বা অন্যকিছু ঘরে রেখে লাভ নেই, এগুলো গুজব। শিশু ও পোষা প্রাণীর প্রতি নজর রাখতে হবে। মানুষকে মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে। বাড়ি পরিষ্কার রাখতে হবে, বাড়ির নিচ তলায় যত্রতত্র জিনিসপত্র রাখা যাবে না। রাতে লাইট জ্বালিয়ে ঘরে চলাফেরা করতে হবে। কারণ সাপের গায়ে পা লাগলে কামড় দিতে পারে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com