ফল বিশ্লেষণে জানা যায়, বছরজুড়ে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতাই এই ফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। এ ছাড়া আগের মতো এবার খাতা দেখায় কোনো সহানুভূতি নম্বর ছিল না।শিক্ষার্থীরা যা পেয়েছে সেটাই তাদের দেওয়া হয়েছে। এ বছর শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বিষয়ে খুব খারাপ করেছে। ফলে পাসের হার কমেছে। অন্তত পাঁচটি শিক্ষা বোর্ড গড় পাসেরও অনেক নিচে রয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেন এই ফল খারাপ হলো—এ জন্য গবেষণা দরকার। তবে আগের সময়গুলোতে সরকার মনে করত, যত বেশি পাসের হার বাড়বে, তত বেশি সাকসেস। সরকার আকারে-ইঙ্গিতে মার্কস বেশি দিতে বলত। কিন্তু এটা কখনোই হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার্থীরা যেটা ডিজার্ভ করে, তাদের সেটাই দিতে হবে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৫-এর ফল প্রকাশিত হয়। সকাল ১০টায় নিজ নিজ শিক্ষা বোর্ড ফল প্রকাশ করে। এরপর এসএমএসসহ নানা মাধ্যমে ফল জানতে পারে শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টায় আন্ত শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড মিলনায়তনে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে করেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার।
এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ শিক্ষার্থী। পাস করেছে সাত লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন। অর্থাৎ পাঁচ লাখ আট হাজার ৭০১ জন পাস করেনি।
গড় পাসের হার ৫৮.৮৩ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে ৬৯ হাজার ৯৭ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন। এবার পাসের হার কমেছে ১৮.৯৫ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ কমেছে ৭৬ হাজার ৮১৪ জন।
২১ বছরে সর্বনিম্ন পাস : এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭.৭৪ শতাংশ। এর পর থেকে পাসের হার ক্রমে বাড়তে থাকে। ২০০৫ সালে পাস করে ৫৯.১৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। এরপর ২০১৬ সালে পাসের হার ছিল ৭৪.৭০ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৬৮.৯২ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬৬.৬৪ শতাংশ, ২০১৯ সালে ছিল ৭৩.৯৩ শতাংশ।
২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। সে বছর সবাইকে অটোপাস দেওয়া হয়। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। সে বছর পাসের হার ছিল ৯৫.২৬ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫.৯৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ছিল ৭৮.৬৪ শতাংশ।
গত বছর পরীক্ষার্থীদের একাংশের চাপের মুখে মাঝপথে বাতিল করা হয় এইচএসসিতে স্থগিত হয়ে পড়া কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা। এ অবস্থায় তখন যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়ে গিয়েছিল, সেগুলোর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। আর যেসব বিষয়ের পরীক্ষা হয়নি, সেগুলোর ফলাফল তৈরি হয়েছিল পরীক্ষার্থীদের এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিং করে। ওই বছর পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ।
২০২ প্রতিষ্ঠান থেকে একজনও পাস করেনি : এ বছর ৯ হাজার ৩০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। দুই হাজার ৮০০ কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজনও পাস করতে পারেনি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৫। এ বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ৩৪৫টি। গত বছর শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩৩৮।
পাসের হার ও জিপিএ ৫-এ মেয়েরা এগিয়ে : আগের মতো এ বছরও পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে আছে মেয়েরা। ২০২৫ সালে পাস করেছে তিন লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৪ জন ছাত্র। অন্যদিকে তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৬ জন ছাত্রী পাস করেছে। ছেলেদের পাসের হার ৫৪.৬০ শতাংশ। মেয়েদের পাসের হার ৬২.৯৭ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩২ হাজার ৫৩ জন ছেলে, আর ৩৭ হাজার ৪৪ জন মেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে ।
বোর্ডভিত্তিক পাসের হার ও জিপিএ ৫ : এ বছর সবচেয়ে বেশি পাসের হার মাদরাসা বোর্ডে, ৭৫.৬১ শতাংশ। তবে জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে ঢাকা বোর্ড। এই বোর্ড থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে ২৬ হাজার ৬৩ জন, পাস করেছে ৬৪.৬২ শতাংশ। মাদরাসা বোর্ডে জিপিএ ৫ পেয়েছে চার হাজার ২৬৮ জন।
সবচেয়ে কম পাসের হার কুমিল্লা বোর্ডে, ৪৮.৮৬ শতাংশ, এই বোর্ডে জিপিএ ৫ পেয়েছে দুই হাজার ৭০৭ জন। রাজশাহী বোর্ডে পাস করেছে ৫৯.৪০ শতাংশ, জিপিএ ৫ পেয়েছে ১০ হাজার ১৩৭ জন। যশোর বোর্ডে পাসের হার ৫০.২০ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে পাঁচ হাজার ৯৯৫ জন। চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫২.৫৭ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে ছয় হাজার ৯৭ জন। বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৬২.৫৭ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে এক হাজার ৬৭৪ জন। সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৫১.৮৬ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে এক হাজার ৬০২ জন। দিনাজপুর বোর্ডে পাসের ৫৭.৪৯ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে ছয় হাজার ২৬০ জন, ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫১.৫৪ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে দুই হাজার ৬৮৪ জন। কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৬২.৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে এক হাজার ৬১০ জন শিক্ষার্থী।
বিষয়ভিত্তিক পাসের হার : এ বছরের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে ইংরেজি বিষয়ে। এরপর খারাপ করেছে তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে। ইংরেজিতে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭৩.৬৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৮.৮২ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৫.২৮ শতাংশ, যশোরে ৫৪.৮২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৬৩.৭৬ শতাংশ, বরিশালে ৭৫.১৬ শতাংশ, সিলেটে ৬৪.৫৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৬৪.৪৭ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ৬১.৯২ শতাংশ।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য : শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এ বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল অনেককে বিস্মিত করেছে। পাসের হার এবং জিপিএ ৫ আগের বছরের তুলনায় কম এবং প্রশ্ন উঠেছে যে এটা কেন? এর উত্তর জটিল নয় বরং সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর। বাংলাদেশে শেখার সংকট শুরু হয় খুব শুরুর দিকেই। প্রাথমিক স্তর থেকেই শেখার ঘাটতি তৈরি হয় এবং সেই ঘাটতি বছরের পর বছর সঞ্চিত হয়। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চাইনি। আমরা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি, যেখানে সংখ্যাই সত্য হয়ে উঠেছিল—পাসের হারই সাফল্যের প্রতীক, জিপিএ ৫-এর সংখ্যা ছিল তৃপ্তির মানদণ্ড। ফলাফল ভালো দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শেখার প্রকৃত সংকট আড়াল করেছি।’
শিক্ষা উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় হিসেবে আমরা কোনোভাবেই এই ফলের দায়িত্ব এড়াতে পারি না। এই ফলাফলকে আমি ব্যর্থতা নয়, বরং আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে দেখছি। প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডকে তাদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার একটি স্বতন্ত্র পর্যালোচনা রিপোর্ট তৈরি করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আমরা শিক্ষাবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করছি, যাঁরা ডেটা বিশ্লেষণ করে শেখার মূল ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করবেন।’
আন্ত শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, ‘আমরা কাউকে কোনো ছক বেঁধে দিইনি বা নির্দিষ্ট করে দিইনি যে এইভাবে নম্বর ছাড় দেবেন অথবা ওভারমার্কিং করবেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই যে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পাস করল না, এটা তো কাঙ্ক্ষিত নয়। এই বিষয়টিতে আমরা একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি। তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, গলদ আছে, অবশ্যই গলদ আছে। সেই গলদের জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে। সেই দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, সেই দায়িত্ব বোর্ডের, সেই দায়িত্ব সবার।’