তবে ঘটনার পর ফায়ারকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে আগুন দেখেছেন। তাই আগুনের সূত্রপাত রাসায়নিকের গুদাম, না পোশাক কারখানা থেকে আগুনের সূত্রপাত, এ ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।গতকাল সন্ধ্যায় তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১৬টি লাশ পেয়েছি। তবে আমাদের সার্চিং অপারেশন এখনো চলমান রয়েছে। অপারেশন কমপ্লিট হওয়ার পর ডিটেইলস জানতে পারব।’
গত রাত সাড়ে ৮টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য এসব মরদেহ ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগের মর্গে আনা হয়। ঢাকা মেডিক্যালের পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, সব মরদেহই আগুনে পোড়া। তাদের মুখ দেখে পরিচয় শনাক্ত করার উপায় নেই। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এখানে ৯ জন পুরুষ ও সাতজন নারীর মরদেহ রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার পর মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
পোশাক কারখানার দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা থেকে এসব লাশ উদ্ধার করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, নিহতরা নারী, না পুরুষ বোঝা যাচ্ছে না। লাশগুলো স্তূপ আকারে ছিল।
এর আগে সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট। পরে আরো ছয়টি ইউনিট যুক্ত হয়। প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস।
সরেজমিনে জানা যায়, সকালে পাশাপাশি দুটি কারখানা ও গুদামে কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। এর মধ্যে রাসায়নিকের গুদামে হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণে এলাকা কেঁপে ওঠে। দ্রুত পাশের তিনতলা কারখানায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা তখন কারখানাটির এক থেকে তিনতলায় কাজ করছিল। বিকেল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে কারখানার দোতলা ও তিনতলা থেকে ৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় আহত আরো অনেককে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বলেন, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রূপনগরের শিয়ালবাড়ি এলাকার ‘কসমিক ফার্মা’ নামের একটি কেমিক্যাল গোডাউন এবং পাশের পোশাক কারখানায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। পর্যায়ক্রমে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট সেখানে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। রাত ৯টা পর্যন্ত পোশাক কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও রাসায়নিক গুদামের আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
ফায়ার সার্ভিসের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ঘটনার ভয়াবহতার কারণে সেখানে দায়িত্বরত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও কমপক্ষে ৩০০ গজ দূরত্ব বজায়ে রাখতে অনুরোধ করেন তাঁরা।
এখনো নিখোঁজ অনেকে, স্বজনদের আহাজারি : ছেলে জয় ও পুত্রবধূ মার্জিয়া সুলতানাকে খুঁজতে এসেছেন বাবা মো. সুলতান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, জয় সকাল ১১টায় আমাকে সর্বশেষ ফোন দিয়ে বলেছিল, ‘বাবা, আগুনে আটকে পড়েছি, বের হতে পারছি না। ধোঁয়ার কারণে শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। আমি আর পারছি না। আমাকে বাঁচাও।’ তিনি বলেন, ‘এর পর থেকে মোবাইলে আর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। জনে জনে ছবি দেখাচ্ছি। কেউ খোঁজ দিতে পারছে না।’
মেয়ে নার্গিস আক্তারের কোনো খবর পাচ্ছেন না মা সুরমা বেগম। মেয়ের পাসপোর্ট সাইজের ছবি হাতে আহাজারি করছেন তিনি।
রাসায়নিকের গুদাম ও পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল ও আশপাশের হাসপাতালগুলোতে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে কান্না করেন অসংখ্য মানুষ। অনেকে প্রিয়জনের ছবি হাতে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস জানায়, পোশাক কারখানার ভেতরে ঢুকতে পারলেও এখনো রাসায়নিকের গুদামে প্রবেশ করা যায়নি।
শফিকুল ইসলাম নামের একজন বলেন, ‘আমার ভাগ্নি মাহিরা গার্মেন্টসের তিনতলায় কাজ করত। তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। আগুন লাগার পর থেকে আমরা তাকে খুঁজছি।’
বিজিএমইএর গভীর দুঃখ প্রকাশ : তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মিরপুরে শাহ আলী ওয়াশিং লিমিটেড ও রাসায়নিক গোডাউনে আগুন লেগে হতাহতের ঘটনায় বিজিএমইএ গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে। নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা ও আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে।
মিরপুরে রূপনগরের যে পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তা বিজিএমইএর সদস্য নয় বলে তৈরি পোশাক উদ্যোক্তাদের এ সংগঠন জানিয়েছে। গতকাল বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে যে কারখানায় আগুন লেগেছে, তা বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কোন পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি ওয়াশিং কারখানা।’
আলামত সংগ্রহ করছে সিআইডি : রূপনগর শিয়ালবাড়ি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সন্ধ্যায় সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গেট বন্ধ করে দেওয়ায় কেউ বের হতে পারেনি, অভিযোগ স্বজনদের : স্বজনদের অভিযোগ, সকালে আগুন লাগার পর নিচের গেট বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। তাই তৃতীয় ও চতুর্থ তলা থেকে কেউ বের হতে পারেনি। ওই দুই ফ্লোরে প্রায় ১০০ জন ছিলেন।
ঘটনস্থলে ছিল উত্সুক জনতার ভিড়। মানুষের অবাধ চলাচলের কারণে আগুন নির্বাপণ ও উদ্ধাকাজে বেগ পেতে হয়েছে। বারবার মাইকিং করছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে র্যাব, বিজিবি, আনসার ও বিইউবিটি শিক্ষার্থী এবং ইসলামী আন্দালন বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকরা।
রাতে এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তাঁদের ধারণা কারখানার পাশে থাকা রাসায়নিকের গুদামে বিস্ফোরণের ঘটনায় সেখান থেকে সাদা ধোঁয়া বা টক্সিক গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে, যা ছিল প্রাণঘাতী। এ আগুন খুব দ্রুত ‘ডেভেলপ স্টেজ’ বা তৃতীয় ধাপে পৌঁছে যায়। ফলে ভুক্তভোগীরা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। অচেতন অবস্থায় তাঁরা প্রাণ হারান।