ফেরদৌসির ঘরের উঠানে কাতরা আর বাসা বানানোর কাজ করছিলেন সালমা, নূরজাহান, খাদিজা, জোসনা, আঁখি, কল্পনা, মিনারা, রাশিদা আর নূপুর। তাঁরা বলেন, আট ইঞ্চি থেকে শুরু করে ১২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের বাসা তাঁরা তৈরি করেন। বড় বাসার জন্য তিন টাকা, মাঝারি দুই টাকা ও ছোট বাসার জন্য এক টাকা পান। প্রতিজন মাসে গড়ে এক হাজার ২০০ বড় বাসা তৈরি করা যায়। তাঁর আক্ষেপ, ‘আমাদের হাতে বানানো জিনিস বিদেশে এত দাম, অথচ আমরা মজুরি পাই সামান্য।’
তবু নারীরা কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন, কারণ ঘরে বসেই উপার্জনের সুযোগ। তবে নারিকেলের ছোবড়া সংকটের কারণে বছরে প্রায় অর্ধেক সময় কাজ বন্ধ থাকে। তখন পুরনো রশি খুলে নতুনভাবে বুনে রাখা হয় পরের মৌসুমের জন্য। তাঁরা বলছেন, প্রস্তুতকারক রাসেল যদি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে বাসা পাঠাতে পারত, তাহলে আমাদের মজুরি বাড়ত।
সম্ভাবনার শিল্প রপ্তানিতে চ্যালেঞ্জ : শুটিয়াকাঠি গ্রামের তরিকুল ইসলাম ৪৪ বছর আগে প্রথম পাখির বাসা বানানো শুরু করেন। এখন তাঁর ছেলে সাইফুল ইসলাম স্থানীয় নারীদের দিয়ে বাসা বুনিয়ে ঢাকায় পাঠান। সেখান থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে পণ্য যাচ্ছে বিদেশে। সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতি মাসে গড়ে ৩০ হাজার বাসা তিনি ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। তারাই এই পাখির বাসাগুলো ইউরোপের ছয় দেশে রপ্তানি করছেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর দেশে অসংখ্য নারিকেলের ছোবড়া নষ্ট হয়। এগুলো কাজে লাগিয়ে শুধু পাখির বাসা নয়, আরো নানা ধরনের হস্তশিল্প তৈরি করা সম্ভব। এতে পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে উঠবে, নারীরা স্বনির্ভর হবেন, আর গ্রামীণ অর্থনীতি হবে আরো শক্তিশালী।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে সাসটেইনেবল ট্যুরিজমের সুযোগ তৈরি করা গেলে দেশের সংস্কৃতি ও প্রকৃতি দুটিই বিশ্বদরবারে নতুনভাবে উপস্থাপিত হবে।’
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) পিরোজপুর কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপব্যবস্থাপক এইচ এম ফাইজুর রহমান বলেন, ‘সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও সরাসরি রপ্তানির সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও রপ্তানিকারকরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। তবে তাঁদের বিশ্বাস, যদি প্রশিক্ষণ, নকশা উন্নয়ন ও সরাসরি রপ্তানির পথ খোলা যায়, তাহলে নারিকেলের ছোবড়া থেকেই গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নতুন এক সবুজ শিল্প, যেখানে পাখির বাসা হবে কেবল শুরু।